রিটায়ারমেন্ট প্ল্যানিং ২০-২৫ বছর বয়স থেকেই কেন শুরু করা উচিত?

Wooden mannequin with a house, coins, and clock symbolizing time and financial planning.

আপনার বয়স কি ২০ থেকে ২৫-এর কোঠায়? সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করেছেন বা চাকরিতে ঢুকেছেন? তাহলে “রিটায়ারমেন্ট” বা অবসর শব্দটা শুনলে নিশ্চয়ই আপনার হাসি পায়। মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক—”এখন তো জীবন শুরু, আর এখনই ভাবব বুড়ো বয়সের কথা? ওসব তো ৪০-এর পরের চিন্তা!”

অধিকাংশ তরুণ-তরুণীই এমনটা ভাবেন। হাতে প্রথম বেতন বা পকেট মানি আসলে আমরা নতুন ফোন, ট্যুর বা বন্ধুদের সাথে আড্ডার পেছনে খরচ করতেই বেশি ভালোবাসি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, রিটায়ারমেন্ট প্ল্যানিং বা অবসরের জন্য টাকা জমানো আসলে “বুড়োদের কাজ” নয়, বরং এটি তরুণদেরই কাজ। কেন জানেন? কারণ আপনার হাতে এখন এমন একটি সম্পদ আছে যা একজন ৪০ বছর বয়সী কোটিপতির হাতেও নেই—আর তা হলো সময়’

আজকে আমরা জানব, কেন ২০-এর কোঠায় থাকতেই অবসরের জন্য সঞ্চয় শুরু করা আপনার জীবনের সেরা সিদ্ধান্ত হতে পারে।

 

এখনই কেন?

ছাত্র বয়সে বা চাকুরী শুরু হতে না হতেই রিটায়ারমেন্ট এর চিন্তা করতে আপনার মন সায় দিবেনা। কিন্তু বিশ্বাস করুন এখন শুরু করে আপনি যে বেনিফিট পাবেন সেটা অন্য কোন সময় পাবেন না । অল্প বয়সে সঞ্চয় শুরু করার পেছনে আপনার ইচ্ছা শক্তি আর সহজ কিছু গাণিতিক যুক্তি ছাড়া আর কোন কারন নেই। চলুন পয়েন্ট আকারে জেনে নিই।

১. কম্পাউন্ডিং-এর জাদুকরী শক্তিঃ বিনিয়োগের দুনিয়ায় অষ্টম আশ্চর্য বলা হয় ‘কম্পাউন্ডিং’ বা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদকে। সোজা কথায়, আপনি যত আগে টাকা জমানো শুরু করবেন, আপনার টাকা তত বেশি সময় পাবে বড় হওয়ার। ধরুন আপনি ২৫ বছর বয়সে প্রতি মাসে ৫,০০০ টাকা করে জমানো শুরু করলেন। আর আপনার বন্ধু ৩৫ বছর বয়সে এসে মাসে ১০,০০০ টাকা করে জমানো শুরু করল। ৬০ বছর বয়সে গিয়ে দেখবেন, আপনি আপনার বন্ধুর চেয়ে অনেক কম টাকা জমিয়েও বেশি টাকার মালিক হয়ে গেছেন। কারণ আপনার টাকা ১০ বছর বেশি সময় ধরে ‘কম্পাউন্ডিং’ হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।

(সুদ ব্যতিত অন্য উপায়েও আপনি আপনার ক্যাপিটাল বাড়াতে পারেন সেক্ষেত্রে আপনাকে বিনিয়োগের অন্যান্য ক্ষেত্র গুলো নিয়ে একটু স্টাডি করতে হবে )

২. অল্প সঞ্চয়েই বিশাল পাহাড় আপনি যখন ২০ বা ২৫ বছর বয়সে সঞ্চয় শুরু করেন, তখন আপনার ওপর বড় কোনো চাপ থাকে না। মাসে মাত্র ৫০০ বা ১০০০ টাকা দিয়েও আপনি শুরু করতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি ৪০ বছর বয়সে গিয়ে শুরু করেন, তখন একই পরিমাণ রিটায়ারমেন্ট ফান্ড বা তহবিল গড়তে আপনাকে বেতনের অর্ধেকটাই জমিয়ে ফেলতে হবে—যা সংসার বা বাচ্চার খরচ চালিয়ে করা প্রায় অসম্ভব। তাই চাপমুক্ত থাকতে এখনই অল্প অল্প করে শুরু করুন।

৩. মুদ্রাস্ফীতিকে হার মানানো (Beating Inflation) আজকে ১০ হাজার টাকায় আপনি যা কিনতে পারেন, ৩০ বছর পর সেই ১০ হাজার টাকার মান হয়তো আজকের ২ হাজার টাকার সমান হবে। একেই বলে ইনফ্লেশন বা মুদ্রাস্ফীতি। আপনি যদি এখনই বিনিয়োগ শুরু না করেন, তবে ভবিষ্যতে আপনার জমানো টাকা দিয়ে কিছুই হবে না। শেয়ার বাজার বা ভালো মিউচুয়াল ফান্ডে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগই একমাত্র উপায় যা দীর্ঘ সময়ে মুদ্রাস্ফীতিকে হারিয়ে আপনার টাকার মান ধরে রাখতে পারে।

৪. অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হওয়া আমাদের দেশে একসময় ধারণা ছিল—”বুড়ো বয়সে ছেলেমেয়েরা দেখবে।” কিন্তু সমাজ ব্যবস্থা পাল্টাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা জীবিকার প্রয়োজনে দেশের বাইরে বা দূরে থাকতে পারে। তখন যেন আপনাকে টাকার জন্য কারো মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে না হয়, সেজন্য নিজের ‘ফিন্যান্সিয়াল ফ্রিডম’ বা আর্থিক স্বাধীনতা নিজেকেই নিশ্চিত করতে হবে। আপনার আজকের সঞ্চয় হবে আপনার ভবিষ্যতের আত্মসম্মান।

৫. ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা তরুণ বয়সে আমাদের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা বেশি থাকে। এই বয়সে আপনি চাইলে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করতে পারেন, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে লাভ বেশি। কিন্তু বয়স বাড়লে মানুষ আর ঝুঁকি নিতে চায় না, তখন নিরাপদ কিন্তু কম লাভের এফডিআর (FDR) বা সঞ্চয়পত্রে টাকা রাখতে হয়। তাই তরুণ বয়সে বিনিয়োগ করলে সম্পদ দ্রুত বাড়ানোর সুযোগ থাকে।

 

রিটারমেন্টের জন্য কত টাকার প্রয়োজন

গবেষনায় দেখা গেছে একজন মানুষের প্রাথমিক চাকুরী বা সংসার জীবনে যে টাকার প্রয়োজন হয় অবসর জীবনে বা তার ৬০ বছর বয়সে এর ১০-১৫ গুন টাকার প্রয়োজন হয়। তার মানে কি, তার বিলাসিতা বেড়ে যায়? আসলে তা না। এই এত বছরে মুদ্রাস্ফিতি, মুল্যস্ফিতি জীবনযাত্রার খরচ, পরিবারের আকার বৃদ্ধি, সন্তানের লেখাপড়া, চিকিৎসা ইত্যাদি খরচ মিলিয়ে আসলেই ৭-১০ গুন বেশী টাকার প্রয়োজন হয়।

আমি দেখেছি ২০০৬ সালে একজন প্রথম শ্রেনীর সরকারী চাকুরীজীবির মাসিক উপার্জন ছিল সর্ব সাকুল্যে ৬৫০০ টাকা। এখন সেই একই কর্মকর্তার মাসিক বেতন ১২০০০০/= টাকার উপরে। খোঁজ নিয়ে দেখবেন তাতেও তার সংসার চালাতে কষ্ট হয়ে যায়। ২০ বছরে উপার্জন বেড়েছে ১০ গুন কিন্তু তিনি কিন্তু বড়লোক হয়ে যাননি। আরো ১০ বছর পর তিনি যখন অবসরে যাবেন তখন তার উপার্জন থাকতে হবে ৫-৭ লক্ষ টাকা যদি তিনি আজকের মত একই মানের জীবন যাপন  করতে চান। অন্যথায় তাকে লাইফস্টাইল কম্প্রোমাইজ করতে হবে। তাহলে আপনাকে ভেবে দেখতে হবে আপনার বর্তমান উপার্জন কত আর অবসর জীবনে আপনার কত উপার্জন প্রয়োজন হবে।

 

কীভাবে শুরু করবেন?

আপনাকে এখনই বেতনের সব টাকা জমিয়ে ফেলতে হবে না। জীবনের সব সাধ আহ্লাদও বিসর্জন দিতে হবেনা। ধীরে শুরু করুন এবং খুব সহজ কিছু ধাপ মেনে চলুন:

বাজেট করুন: হিসাব করুন আপনি কত টাকা পেনশন পাবেন আর কত টাকা আপনার জমানো টাকা থেকে আসবে। কি পরিমান টাকা জমালে বা কি কি এসেট করলে অবসর জীবনে আপনার একটি নির্দিষ্ট ইনকাম জেনারেট হবে। এই সব ক্যাল্কুলেশন করে বেতনের বা আয়ের অন্তত ১০-২০% টাকা রিটায়ারমেন্টের জন্য আলাদা করুন।

ডিপিএস: প্রতি মাসে অটোমেটিক টাকা কেটে নেবে এমন কোনো স্কিম চালু করুন।

প্রভিডেন্ট ফান্ডঃ আপনার সরকারী বা বেসরকারী চাকুরীর নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ পরিমান টাকা প্রভিডেন্ট ফান্ডে রাখুন।

প্যাসিভ ইনকামঃ  চাকুরী জীবনেই একটি প্যাসিভ ইনকাম জেনারেট করার চেষ্টা করুন। এমন কোন এসেট করার চেষ্টা করুন যেটা আপনাকে বসে থাকলেও টাকা এনে দেবে। যেমন রিয়েল স্টেট, দোকান, শোরুম, ওয়েবসাইট, এফিলিয়েট মার্কেটিং ইত্যাদি।

বিলাসিতা কমান: প্রয়োজন আর শখ বুঝে খরচ করুন। শখ গুলোকে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অংশ না করে রিওয়ার্ড হিসাবে পুরন করতে হবে।

জিরো লোন পলিসিঃ লোন করবেন না। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। নিজের সামর্থের মধ্যে চলার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

 

উপসংহার :

রিটায়ারমেন্ট প্ল্যানিং মানে বর্তমানের আনন্দ বিসর্জন দেওয়া নয়, বরং ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। ২০ বছর বয়সে সঞ্চয় শুরু করা মানে আপনি আপনার ভবিষ্যৎ নিজেকেই উপহার দিচ্ছেন। ভাবুন তো, ৬০ বছর বয়সে যখন আপনার বন্ধুরা টাকার চিন্তায় অস্থির থাকবে, তখন আপনি থাকবেন নিশ্চিন্ত এবং স্বাধীন। তাই “কাল থেকে শুরু করব”—এই কথা না বলে, আজ থেকেই আপনার ভবিষ্যতের জন্য প্রথম ইটটি গেঁথে ফেলুন। মনে রাখবেন, দৌড়ে জেতার জন্য জোরে দৌড়ানোর চেয়ে আগে দৌড় শুরু করাটা বেশি জরুরি।