ছাত্রজীবনে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার কার্যকরী টিপস
ছাত্রজীবনে পকেটে টান পড়াটা খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। মাসের শুরুতে পকেট মানি পাওয়ার পর কয়েকদিন রাজকীয় হালে চললেও, ২০ তারিখ পার হতে না হতেই দেখা যায় পকেটে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এরপর শুরু হয় বন্ধুদের কাছে ধারদেনা করা, ক্যান্টিনে বাকি খাওয়া, দোকানে বাকিতে কেনাকাটা করা ইত্যাদি। আবার পরবর্তী মাসে ধারদেনা বা বাকি শোধ করতেই পকেটের বারোটা বেজে যায়। এই অভিজ্ঞতা প্রায় প্রতিটি ছাত্রের জীবনেই ঘটে। তারা ব্যাতিত, যারা জানে ছাত্র জীবনে শুধুমাত্র বাবার দেয়া পকেট মানির উপর নির্ভর না করে কি করে এক্সট্রা ইনকাম করা যায় বা কিভাবে টাকা ম্যানেজ করতে হয়। আপনি যদি ছাত্রাবস্থায় আপনার সামান্য টাকাটুকু ঠিকঠাক ম্যানেজ করতে পারেন, তবে ভবিষ্যতে আপনি বড় বড় ফিন্যান্সিয়াল চ্যালেঞ্জ সহজেই মোকাবেলা করতে পারবেন।
আজকে আমরা জানব, পকেট মানি থেকে বাঁচিয়ে কীভাবে সঞ্চয় করা যায় বা ছাত্র অবস্থায় কিভাবে এক্সট্রা ইনকাম করে সচ্ছলভাবে জীবনযাপন করা যায় ।
ছাত্রজীবনে আমাদের আয়ের উৎস থাকে সীমিত। অধিকাংশ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। হয়তো বাবা-মায়ের দেওয়া হাতখরচ বা টিউশনি থেকে পাওয়া সামান্য কিছু টাকা। এই অল্প টাকা দিয়ে পড়াশোনার খরচ, থাকা খাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা আর ব্যক্তিগত শখ পূরণ করা বেশ কঠিন হয়ে পরে। তবে বিশ্বাস করুন, সমস্যাটি যতটা না টাকার পরিমাণ তার চেয়েও বেশি আপনার “টাকা খরচ করার ধরণ”-এর উপর নির্ভর করে।
আপনার এই সামান্য পকেট মানি দিয়েই কীভাবে স্মার্টলি মাস পার করবেন এবং কিছু সঞ্চয় করবেন, এবং ছাত্র জীবনেই স্বাবলম্বী হবেন তা নিয়েই আজকের আলোচনা।
১। প্রথমেই খরচের পরিকল্পনাঃ শুধু শিক্ষার্থী নয় আমরা অধিকাংশ মানুষই কোন পরিকল্পনা ছাড়াই মাসের খরচ শুরু করি। এর পর যখন মাসের মাঝামাঝি গিয়ে হাতে টান পড়তে থাকে তখন খরচের পরিকল্পনা করি। আমাদের সমাজে সঠিক অর্থনৈতিক শিক্ষা না থাকাতেই এমনটি হয় যা কোন ভাবেই উচিৎ নয়। ছাত্র জীবনে আয় থাকে খুবই সীমিত তাই মাসের প্রথমেই একটি বাজেট পরিকল্পনা করা অত্যান্ত অপরিহার্য। আপনার আয় কোথা থেকে আসছে আর কিভাবে খরচ হবে তা যথাযথভাবে লিখে ফেলতে হবে। ধার করার প্রয়োজন হলে তাও লিখে ফেলতে হবে এবং তা কিভাবে পরিশোধ হবে তা আগেই ঠিক করে রাখতে হবে।
২। ‘আগে সঞ্চয়, পরে খরচঃ অধিকাংশ শিক্ষার্থী টাকা জমানোর চিন্তা মাথাতেই রাখেনা। যখন তাদেরকে কেউ টাকা জমানোর পরামর্শ দেয় তখন তারা বলে “মাসই চলেনা আবার সেভিংস”। কিন্তু বিশ্বাস করুন আপনি এই স্বল্প টাকা থেকেই যদি খুব সামান্য কিছু সঞ্চয় করতে পারেন আপনি ভবিষ্যতে খুব বড় কিছু হবেন এটা মোটামুটি নিশ্চিত। পকেট মানি পাওয়ার সাথে সাথেই অন্তত ১০% টাকা একটি মাটির ব্যাংক বা আলাদা অ্যাকাউন্টে সরিয়ে রাখুন। ধরুন আপনি ৩০০০ টাকা পেলেন, শুরুতেই ৩০০ টাকা আলাদা করে ফেলুন। বাকি ২৭০০ টাকা দিয়ে মাস চালানোর পরিকল্পনা করুন। এটি আপনার মধ্যে শৃঙ্খলার জন্ম দেবে। এভাবেই ধীরে ধীরে দেখবেন আপনার হাতে একটি ভালো পরিমান টাকা জমা হয়ে আছে যা আপনাকে আপনার আপদকালীন সময়ে সাহায্য করবে বা আপনি এই টাকা অন্য কোনখানে বিনিয়োগ করে আরো টাকা উপার্জন করতে পারবেন।
৩। প্রয়োজন বনাম বিলাসিতাঃ ছাত্রজীবনে আকর্ষণীয় গ্যাজেট বা নামী ব্র্যান্ডের কাপড়ের প্রতি লোভ থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু কেনার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন “এটা কি আমার সত্যিই প্রয়োজন নাকি আমি শুধু শখের বসে কিনছি?” কোনো কিছু হুট করে কিনতে ইচ্ছা করলে ‘৪৮ ঘণ্টা নিয়ম’ মেনে চলুন। কোনো অনলাইন শপ বা দোকানে কোনো জিনিস পছন্দ হলে সাথে সাথে না কিনে ৪৮ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। দেখবেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে ২ দিন পর আপনার আর সেই জিনিসটি কিনতে ইচ্ছা করছে না। বন্ধুদের আড্ডা এড়িয়ে চলার প্রয়োজন নেই তবে খেয়াল রাখতে হবে চা নাস্তার বিল মেটাতে যেন শুধু আপনার পকেটেই হাত না পরে। তাতে হয়তো বন্ধু মহলে আপনাকে একটু কৃপন আখ্যা দেয়া হতে পারে তাতে কি আপনার যখন টাকার প্রয়োজন হবে তখন কেউ আপনাকে টাকা দিতে আসবেনা। সুতরাং বিলাসিতা আর বাজে খরচ এড়িয়ে চলতে হবে।
৪। স্মার্টলি যাতায়াত ও খাবার খরচ কমানোঃ শিক্ষার্থীদের খরচের বড় একটি অংশ চলে যায় যাতায়াত এবং বাইরের খাবারে। প্রতিদিন রিকশায় চড়া বা ক্যাফেতে রেস্টরেন্টে খাওয়া আপনার পকেটে বড় গর্ত তৈরি করতে পারে। যেখানে সম্ভব হাঁটার অভ্যাস করুন অথবা গণপরিবহন (বাস বা মেট্রো) ব্যবহার করুন। দুপুরের খাবার বাইরে না খেয়ে বাসা থেকে টিফিন নিয়ে আসার চেষ্টা করুন। যারা হলে বা মেসে থাকেন তার ডাইনিং এ খাওয়ার অভ্যাস করুন। সম্ভহ হলে নিজে রান্না শিখে নিন। ভালো কিছু খেতে ইচ্ছা করলে রান্না করে খান এতে খরচ কম পরবে এটি আপনার স্বাস্থ্য এবং পকেট দুটোর জন্যই ভালো।
৫। স্টুডেন্ট আইডি কার্ডের সর্বোচ্চ ব্যবহার অনেকেই জানে না যে, স্টুডেন্ট আইডি কার্ড ব্যবহার করে অনেক জায়গায় টাকা বাঁচানো সম্ভব। বাস বা ট্রেনের ভাড়ায় স্টুডেন্ট কনসেশন নিন। অনেক সফটওয়্যার, সাবস্ক্রিপশন, এমনকি রেস্টুরেন্ট বা বইয়ের দোকানেও শিক্ষার্থীদের জন্য ডিসকাউন্ট থাকে। টাকা দেওয়ার আগে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করুন—”ছাত্রদের জন্য কোনো ডিসকাউন্ট আছে কি না?” সামান্য একটু লজ্জা আপনার অনেক টাকা বাঁচিয়ে দেবে।
৬। ডিজিটাল সেভিংস ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগের হাতেখড়িঃ এখনকার যুগে মাটির ব্যাংকে খুব কম মানুষই টাকা জমা রাখে। এখন অনেক ডিজিটাল মাধ্যম আছে যেখানে আপনি খুব অল্প টাকা জমাতে বা বিনিয়োগ করতে পারেন। বিকাশ বা নগদের মতো MFS অ্যাপে ছোট ছোট সেভিংস স্কিম চালু করতে পারেন। এছাড়া আপনার যদি কিছু টাকা জমে যায়, তবে বড় কোনো ঝুঁকি না নিয়ে মিউচুয়াল ফান্ড বা ভালো মানের শেয়ার সম্পর্কে পড়াশোনা শুরু করতে পারেন। ছাত্রাবস্থায় বিনিয়োগের শিক্ষা আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে দাঁড়াবে।
৭। ছোট্ট একটা ব্যবসা দাড় করানোর চেষ্টা করাঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার একজন বন্ধু ছিল যাকে আমি দেখতাম নিজের জমানো টাকা দিয়ে নীলক্ষেত থেকে পুরাতন একাডেমিক এবং গল্প উপন্যাসের বই কিনে নিয়ে আসতো। প্রথম দিকে খুব বেশী বিক্রি হতো না তবে কিছুদিন পরই ওর একটা বিশাল কালেকশান তৈরী হলো। ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়লো এবং ছাত্র অবস্থাতেই সে বই বিক্রি করে অনেক টাকা ইনকাম করতো। পড়াশুনা শেষ করেও সে এখন চাকুরীর পাশাপাশি একটা অনলাইন বুকশপের বিজনেস করে। আপনিও চাইলেই ছাত্র জীবনে এরকম কোন ব্যবসা দাড় করিয়ে অতিরিক্ত আয় করতে পারেন।
৮। অনলাইন কোচিংঃ ছাত্রজীবনে সময় খুবই মুল্যবান। অযাথা সময় নষ্ট করা উচিৎ নয়। অনেকেই এক্সট্রা ইনকামের জন্য টিউশনি করায়। বাড়ী বাড়ী গিয়ে টিউশনি করাতে অনেকটা সময় ব্যয় হয় এবং এটি কষ্টসাধ্যও বটে। এখন ডিজিটাল যুগে আপনি খুব সহজেই অনলাইন কোচিং করাতে পারেন যেখানে একই সাথে একাধিক ছাত্র একই প্লাটফর্মে যুক্ত হয়ে কোচিং নিতে পারে এতে করে আপনার সময় বাচবে এবং ঘরে বসেই অতিরিক্ত অর্থ আয় হবে।
৯। ফ্রিল্যান্সিংঃ এটা নিয়ে নিশ্চই নতুন করে কিছু বলতে হবে না। ছাত্র জীবনেই দুই একটি স্কীল ভালোভাবে রপ্ত করে ফেলতে চেষ্টা করুন এবং অবসর সময় কাজে লাগিয়ে আপনি ফ্রিল্যান্সিং প্লাটফর্মগুলো থেকে অতিরিক্ত আয় করতে পারেন। এটা শুনতে সহজ মনে হলেও এতটা সহজ নয় আবার কঠিনও নয়। তবে আপনার স্কীল ভালো হলে আপনি অবশ্যই আয় করতে পারবেন।
১০। পার্ট টাইম জবঃ উন্নত বিশ্বের ন্যায় এখন বাংলাদেশেও স্টুডেন্টরা বিভিন্ন জায়গায় পার্ট টাইম যব করতে পারে যেমন শপিং মল, রেস্তোরা, এডভার্টাইজিং,সার্ভে ইত্যাদি। এছাড়াও আমি কিছু কিছু স্টুডেন্ট কে উবার পাঠাও এর মতো রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্মে কাজ করে ইনকাম করতেও দেখেছি। আপনিও চাইলে আপনার সুবিধা ও সময় বিবেচনা করে কোন পার্টটাইম জব থেকে এক্সট্রা আর্ন করতে পারেন।
টাকা জমানো মানে কৃপণতা করা নয় বা ছাত্র জীবনে টাকা ইনকাম করা লজ্জার বিষয় নয় বরং নিজের ভবিষ্যতের জন্য একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করা। আজ আপনি যে ছোট কিছু উপার্জন করছেন বা আপনার পকেট মানি থেকে যে ১০০ বা ২০০ টাকা বাঁচাচ্ছেন, সেটিই আপনাকে ভবিষ্যতে বড় কোনো বিপদে বা বিনিয়োগের সুযোগে সাহায্য করবে। মনে রাখবে বিন্দু থেকেই কিন্তু সিন্ধু তৈরী হয়।
