ডিভিডেন্ড ইনভেস্টমেন্ট: ঘুমিয়ে থেকেও আয়ের সেরা কৌশল
অনেকেই শেয়ার বাজারকে লটারি বা জুয়া খেলার মত মনে করে। “যদি লাইগা যায়” মেথডে ট্রেড করে। শেয়ার মার্কেট থেকেও যে নিশ্চিত আয় করা যায় এটা অনেকে মানতে চায় না। কারন আমাদেরকে প্রতিনিয়ত শেখানো হয় শেয়ার মার্কেট ঝুকিপুর্ণ। এখানে যওয়া মানে নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফেরা। কিন্তু এই মার্কেট যদি এতটাই খারাপ হতে তাহলে তো এতদিন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। বরং যারা জেনে বুঝে এই ব্যবসা করে অনেকের কাছে এটাই তাদের নিয়মিত আয়ের উৎস। শেয়ার বাজার থেকে বাড়ি ভাড়ার মতো বা ব্যাংকের ডিপিএস-এর মতো নিয়মিত বাৎসরিক আয় করা যায়, তা হয়তো আপনি জানেন কিন্তু সঠিক পরামর্শের অভাবে তা নিতে পারছেন না। আজকে আমরা সেই নিরাপদ কৌশলটি নিয়েই আলোচনা করব।
প্রখ্যাত বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফেট একবার বলেছিলেন, “আপনি যদি এমন কোনো রাস্তা খুঁজে না পান যাতে ঘুমিয়ে থাকার সময়েও আপনার আয় হতে থাকে, তবে আপনাকে আমৃত্যু কাজ করে যেতে হবে।” আর একটা কথা প্রচলিত আছে “যদি উপরে দিকে উঠার ইচ্ছা থাকে কিন্তু উপায় খুজে না পাও তবে যারা উপরে যাচ্ছে তাদের লেজ ধরে ঝুলে পড়”। অর্থাৎ যারা উন্নতি করছে তাদের সাথে একই জায়গায় ইনভেস্ট করো তাহলে তোমার উন্নতিও নিশ্চিত। ওয়ারেন্ট বাফেটের সেই আয়ের উৎস অথবা বড়লোকদের সেই লেজ হচ্ছে ডিভিডেন্ড ইনভেস্টমেন্ট (Dividend Investment)।
ডিভিডেন্ড ইনভেস্টমেন্ট আসলে কী?
খুব সহজ একটি উদাহরণ দিই। ধরুন, আপনি একটি ফলের বাগান কিনেছেন। এখন দুইভাবে আপনি লাভ করতে পারেন: ১. পুরো বাগানটি বেশি দামে অন্যের কাছে বিক্রি করে দিয়ে (Capital Gain)। ২. অথবা, বাগানটি নিজের কাছে রেখে প্রতি বছর সেখান থেকে ফল সংগ্রহ করে বিক্রি করে (Dividend Income)।
শেয়ার বাজারে ডিভিডেন্ড ইনভেস্টমেন্ট হলো সেই ফলের বাগানের মতো। আপনি একটি ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনবেন এবং দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখবেন। কোম্পানিটি প্রতি বছর যে লাভ করবে, তার একটি অংশ আপনাকে নগদ টাকা (Cash Dividend) হিসেবে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেবে। শেয়ার বিক্রি না করেও এই আয় পাওয়া যায়। আবার আপনি চাইলে ডিভিডেন্ড তুলে নেয়ার পর সন্তোষজনক দাম পেলে মুল শেয়ার গুলোও লাভে বিক্রি করে দিতে পারেন।
কেন এটি “নিশ্চিত আয়ের” সেরা কৌশল?
শেয়ারের দাম প্রতিদিন বাড়ে বা কমে। আজ যে শেয়ারের দাম ১০০ টাকা, কাল তা ৯০ টাকা হতে পারে। কিন্তু কোম্পানি যদি ভালো হয়, তবে শেয়ারের দাম কমলেও তারা বছর শেষে ঠিকই আপনাকে ডিভিডেন্ড দেবে।
ডিভিডেন্ড ইনভেস্টমেন্টের ৩টি বড় সুবিধা:
১. প্যাসিভ ইনকাম (Passive Income): আপনি চাকরি বা ব্যবসা করছেন, তার পাশাপাশি শেয়ার বাজার থেকে প্রতি বছর একটি বাড়তি আয়ের চেক আসছে।
২. নিরাপত্তা: যেসব কোম্পানি নিয়মিত ডিভিডেন্ড দেয়, সেসব কোম্পানি সাধারণত খুব শক্তিশালী হয়। ধস নামলেও এদের শেয়ারের দাম খুব একটা কমে না।
৩. কম্পাউন্ডিং-এর জাদু: পাওয়া ডিভিডেন্ডের টাকা খরচ না করে যদি তা দিয়ে আবারও ওই কোম্পানির শেয়ার কেনেন, তবে কয়েক বছর পর দেখবেন আপনার আসল বিনিয়োগের পরিমাণ জাদুর মতো বেড়ে গেছে।
ডিভিডেন্ড স্টক চেনার উপায় (How to Pick Dividend Stocks in DSE)
বাংলাদেশের শেয়ার বাজারে (DSE) শত শত কোম্পানি আছে। এর মধ্যে থেকে সোনার ডিম পাড়া হাঁসটি কীভাবে খুঁজে বের করবেন? লক্ষ্য রাখুন ৩টি বিষয়ের ওপর:
১. ডিভিডেন্ড ইয়েল্ড (Dividend Yield): সহজ কথায়, আপনি ১০০ টাকা বিনিয়োগ করে বছরে কত টাকা ফেরত পাচ্ছেন। ব্যাংকে টাকা রাখলে যদি ৬% সুদ পান, আর শেয়ার বাজার থেকে যদি ৭-৮% বা তার বেশি ডিভিডেন্ড ইয়েল্ড পান, তবে সেটি নিঃসন্দেহে ভালো বিনিয়োগ।
২. ধারাবাহিকতা (Consistency): কোম্পানিটি কি গত ৫-১০ বছর ধরে নিয়মিত ডিভিডেন্ড দিচ্ছে? নাকি এক বছর দিয়েই বন্ধ করে দিয়েছে? ডিভিডেন্ড ইনভেস্টরদের জন্য ইতিহাস বা ট্র্যাক রেকর্ড খুব গুরুত্বপূর্ণ।
৩. আয়ের উৎস (Earnings Growth): কোম্পানিটি কি তার মূল ব্যবসা থেকে লাভ করছে? নাকি সম্পত্তি বিক্রি করে ডিভিডেন্ড দিচ্ছে? মূল ব্যবসা থেকে লাভ আসা কোম্পানিই দীর্ঘমেয়াদে ডিভিডেন্ড দিতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে: সাধারণত ফার্মাসিটিক্যাল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি (Power & Fuel), বহুজাতিক কোম্পানি (MNCs) এবং কিছু ভালো মৌলভিত্তির ব্যাংক নিয়মিত এবং ভালো ডিভিডেন্ড দেওয়ার জন্য পরিচিত। বাজার এনালাইসিসকারী কোন ওয়েবসাইটে নিয়মিত নজর রাখতে রাখুন। একটি ওয়াচলিস্ট তৈরী করুন। এবং দেখে শুনে বিনিয়োগ করুন।
কাদের জন্য এই কৌশল সেরা?
- অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি: যারা পেনশনের টাকা বা সঞ্চয়পত্র থেকে আয়ের বিকল্প খুঁজছেন।
- চাকরিজীবী: যারা চাকরির পাশাপাশি একটি সেকেন্ড ইনকাম সোর্স তৈরি করতে চান।
- নিরাপদ বিনিয়োগকারী: যারা শেয়ার বাজারের প্রতিদিনের ওঠানামা বা টেনশন নিতে চান না।
লক্ষ্য করুনঃ আপনার মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্র থেকেও তো নিয়মিত প্রফিট বা সুদ পাওয়া যায় তাহলে আমি শেয়ার বাজারের এই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ কেন করবো? দেখুন ব্যাংক বা সঞ্চয়পত্র থেকে লাভ তুলতে আপনাকে ১ বছর অবশ্যই বিনিয়োগ ধরে রাখতে হবে। কিন্তু শেয়ার বাজারে সেটি ৬ মাস এমনকি ৩ মাসেও সম্ভব যদি আপনি সুযোগ কে কাজে লাগাতে পারেন।
প্রতিটি কোম্পানী বছরে চারবার তাদের আর্থিক রিপোর্ট পেশ করে। হাস্যকর হলেও সত্য অনেক ভালো কোম্পানী খুব ভালো রিপোর্ট পেশ করলেও বাংলাদেশে কোন এক অজানা কারনে এর দাম কমে যায়। আপনি তৃতীয় প্রান্তিকের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করুন। যদি এমনটি হয় যে তিনটি কোয়ার্টারেই আগের বছরের তুলনায় রিপোর্ট ভালো কিন্তু সেই তুলনায় দাম কম তাহলে বিনিয়োগ করুন। অপেক্ষা করুন আশা করি নিরাশ হবেন না।
শেষ কথা: একটি আম গাছের গল্প
ডিভিডেন্ড ইনভেস্টমেন্ট হলো একটি আম গাছ লাগানোর মতো। আজ চারা লাগালেন (শেয়ার কিনলেন), কালই হয়তো ফল পাবেন না। কিন্তু আপনি যদি ধৈর্য ধরে পানি দেন এবং যত্ন নেন (শেয়ারটি ধরে রাখেন), তবে কিছুদিন পর এই গাছটি আপনাকে ছায়াও দেবে, আবার প্রতি বছর ঝুড়ি ভর্তি আমও দেবে।
শেয়ারের দামের দিকে না তাকিয়ে, কোম্পানির ব্যবসার দিকে তাকান। একটি ভালো ডিভিডেন্ড পোর্টফোলিও আপনার ভবিষ্যতের আর্থিক স্বাধীনতার চাবিকাঠি হতে পারে।
(Disclaimer: এই লেখাটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে। শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজে যাচাই করুন বা অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিন।)
