বাংলাদেশের শেয়ার বাজার অন্যান্য দেশের শেয়ার বাজার থেকে আলাদা কেন?

বিশ্বের প্রায় সব শেয়ার বাজার একই নিয়মেই পরিচালিত হয়। স্টকের মৌলিক বিশ্লেষন এর বাহিরেও বাজার উঠা নামা, শেয়ারের মুল্য নির্ধারন, বাজারের সার্বিক সেন্টিমেন্ট নির্ভর করে সেই দেশের ট্রেডারদের উপর। বাংলাদেশও এর ব্যাতিক্রম নয়। তবে বাংলাদেশের ট্রেডারদের সেন্টিমেন্ট অন্যান্য দেশের মত নয় বরং অনেকটাই অদ্ভুত প্রকৃতির। আর এর ফলে বাংলাদেশের শেয়ার বাজারও অন্যান্য দেশের থেকে ব্যতিক্রম আচরন করে। আপনি দেখবেন একটি স্টকের মৌলিক অবস্থা অনেক উন্নত, কোম্পানি প্রোফাইল অনেক ভালো, নিয়মিত ভালো ডিভিডেন্ড দেয় কিন্তু সেই শেয়ারের চাহিদা কম, মুল্য ওঠানামাও নগন্য। অন্যদিকে একটি অখ্যাত কোম্পানি, কেউ চিনেও না উৎপাদনও হয়তো বন্ধ অথচ শেয়ার বাজারে দাম হু হু করে বাড়ছে। এমনটি কেন হয়? চলুন একটু আলোচনা করা যাক।
১। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর আধিপত্য।
উন্নত দেশের শেয়ার বাজারে প্রাতিষ্ঠানিক, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ইনস্টিটিউশন—এই ধরনের প্রফেশনাল অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেশি থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে ৭০–৮০% ট্রেডই ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী দ্বারা হয়, প্রতিষ্ঠানগত বিনিয়োগকারী তুলনামূলকভাবে কম, মিউচুয়াল ফান্ড, পেনশন ইনস্টিটিউশনগুলি শক্তিশালী নয়। ফলে বাজার ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের সেন্টিমেন্ট এর উপর উঠানামা করে।
২। বাংলাদেশের ট্রেডারদের মনস্তত্ত্ব।
বাংলাদেশের বাজারে ট্রেডারদের আচরণ প্রায় ৮০% পর্যন্ত বাজারের গতিপথ ঠিক করে। তাদের মনস্তত্ত্ব গঠিত হয়: বাংলাদেশি সামাজিক বাস্তবতা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা শিক্ষাগত ব্যাকগ্রাউন্ড বাজারে ইতিহাস, আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা, লোভ ও ভয় (Fear & Greed)। এই কারণগুলো ট্রেডারদের সিদ্ধান্তকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের ট্রেডারদের কিছু মূল বৈশিষ্ট্য: গুজব নির্ভর ট্রেড “এই শেয়ার যাবে!”—এমন খবর পেলে জটলা বেধে যায়। অনুকরণ মানসিকতা, একজন কিনলে বাকিরাও কিনে । রিস্ক ম্যানেজমেন্ট নাই, স্টপ লস সেট করে না, averaging করে নিচে যায়। প্রফিট কম করে, Loss বেশি দেয়, দ্রুত প্রফিট বুক করে কিন্তু লম্বা সময় লস ধরে রাখে। ফলাফল লাভের তুলনায় লোকসান বেশী।
৩। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের দ্রুত লাভ করা ও গুজবে ট্রেড করার প্রবণতা।
বাংলাদেশি ট্রেডারদের একটি বড় অংশের চিন্তা – দ্রুত লাভ করতে হবে, নিজে পড়াশুনা করে সময় নষ্ট করার কি দরকার, অমুক ভাই বলছে এটা কিনলে দুইদিনেই ডাবল হবে, আজকে যেহেতু বাড়ছে এটা এখন শুধু বাড়তেই থাকবে ইত্যাদি। অন্য দেশে স্টক দীর্ঘ সময় ধরে রাখার কালচার বেশী, কিন্তু বাংলাদেশে স্বল্প সময়ে বড়লোক হওয়ার প্রবনতা বেশী, দীর্ঘ মেয়াদী ইনভেষ্টমেন্ট কম, মৌলিক বিশ্লেষনে অনিহা, টেকনিক্যাল বা নিউজ ভিত্তিক ট্রেড করার প্রবনতা বেশীগ এটা বাজারকে খুব ভোলাটাইল এবং অস্থির করে তোলে।
৪। স্বল্পমেয়াদি মানসিকতা (Short-term mindset)
বাংলাদেশের অধিকাংশ ট্রেডার দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকারী নন। দ্রুত লাভ, T-plus 1 রিটার্ন কিংবা কিছুদিনে বড় মুনাফা পাওয়ার স্বপ্নে বিনিয়োগ করেন। যার ফলে মৌলিকভাবে শক্তিশালী কোম্পানির চেয়ে “হাইপ-চালিত” কোম্পানির পেছনে ছুটে যান। যখন বাজারে লাল বাতি জ্বলে (পতনের ভয়), তখন সবাই একসাথে বিক্রি করেন; আর যখন বাজার সবুজ হয়, তখন সবাই একই সাথে কেনার জন্য ভিড় করেন। ফলে বাজারে অস্থিতিশীলতার মাত্রা বেড়ে যায়।
৫। আর্থিক জ্ঞান ও শিক্ষার অভাব।
বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীরা শেয়ার মার্কেট নিয়ে পড়াশুনা করতে আগ্রহী নয়। তারা ভাবে শেয়ার বাজারে এসব সিস্টেম কাজ করেনা বরং তারা অন্যের বা Facebook / YouTube গ্রুপের পরামর্শে কথায় লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে শেষে নিঃস্ব হয়ে শেয়ার বাজারের দোষ দেয়। অনেক বিনিয়োগকারী জানেই EPS, NAV, PE Ratio, Free-float shares, dividend payout এসব মানে কি। মৌলিক ধারণা অনেক বিনিয়োগকারীরই জানা নেই। তারা শুধু “follow trade” করেন এবং Facebook / YouTube গ্রুপের পরামর্শে বিনিয়োগ করেন।
৬। বাজার কারসাজি এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব।
বাংলাদেশে কিছু শেয়ারে সিন্ডিকেট গ্রুপ কাজ করে। তারা—শেয়ার কিনে বাজারে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরী করে, পরবর্তিতে দাম বাড়িয়ে হাইপ তৈরি করে, ভুয়া খবর ও গুজব ছড়ায়, এরপর শেয়ার ছেড়ে দিয়ে লাভ তুলে নেয়। অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী এই ফাঁদে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ বিনিয়োগকারী। উন্নত বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো শক্তিশালী হওয়ায় বাজার কারসাজি এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব সাধারনত কম হয়।
৭। তথ্যের স্বচ্ছতা কম।
অনেক কোম্পানি তথ্য সময়মতো প্রকাশ করে না, প্রকাশিত তথ্য অনেক সময় বিশ্বাসযোগ্যতা পায়না, ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনিয়মিত, আয়-ব্যায় এর তথ্য গড়মিল করার ইতিহাস আছে, এ সব কারনে বিনিয়োগকারীরা গুজবে কান দেয় এবং গুজবেই কেনা বেচা করে।
৮। সার্কিট ব্রেকার সিস্টেম।
বাংলাদেশে মাঝে মাঝেই শেয়ারের দাম উঠা-নামার কড়াকড়ি সীমা নির্ধারন করা হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে: যদি একটি শেয়ারের ক্লোজিং প্রাইজ হয় ১০০ টাকা হয়, এবং সার্কিট ব্রেকার ১০% হয়, তাহলে সেই দিন ঐ শেয়ারের দাম সর্বোচ্চ ১১০ টাকা এবং সর্বনিন্ম ৯০ টাকা হতে পারবে। বাজারের সামগ্রিক অবস্থা, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অতিরিক্ত ওঠানামা হলে নিয়ন্ত্রকরা (BSEC) অস্থায়ীভাবে সীমা কড়াকড়া বা শিথিল করে। ২০২২ সালে শেয়ার পতনের চাপের কারণে সার্কিট ব্রেকার সীমা ১০% থেকে ২% পর্যন্ত নেমেছিল।
ভালো কোম্পানির দাম বাড়ে না কেন?
কারণ:
- বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কম
- লেনদেন কম = তারল্য কম
- দ্রুত লাভ পাওয়া যায় না
- গুজব থাকে না
- দাম স্থির থাকে, ফলে ট্রেডাররা “মজা” পান না
উদাহরণস্বরূপ:
একটি কোম্পানি যদি নিয়মিত ২০-৩০% নগদ ডিভিডেন্ড দেয়, EPS ভালো থাকে, কিন্তু দাম স্থির থাকে—তাহলে দ্রুত লাভপ্রত্যাশী ট্রেডারদের কাছে এটি আকর্ষণীয় নয়।
বিপরীতে খারাপ বা নিষ্ক্রিয় কোম্পানির দাম কেন বাড়ে?
কারণ:
- Syndicate দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ায়
- ছোট free-float হওয়ায় দাম সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায়
- গুজব ছড়ানো হয়
- ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা ভিড় করে
- দাম বাড়লে FOMO তৈরি হয়।
FOMO = Fear Of Missing Out — বাংলা অর্থ “মিস হয়ে যাওয়ার ভয়” বা “সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয়”। উদাহরণ কোনো শেয়ারের দাম ৫০ টাকা থেকে ৭০ টাকা হয়ে গেল খুব দ্রুত। মানুষ ভাবে—“আরো বাড়বে! এখন না কিনলে পরে আর কিনতে পারবো না!” এই ভয়টাই হলো FOMO।
ফলাফল:
- অখ্যাত কোম্পানির দাম ১ মাসে ১০০% বাড়ে
- পরে একইভাবে ভেঙে পড়ে
- হাজারো বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়
উপসংহার
বাংলাদেশের শেয়ার বাজার নিয়মে বিশ্ববাজারের মতো হলেও আচরণে ভিন্ন, কারণ বিনিয়োগকারীদের মানসিকতা ও সেন্টিমেন্ট অনেকটাই আবেগপ্রবণ, গুজব ও রিউমার ভিত্তিক কেনাবেচা, বাজার কারসাজি এবং সিন্ডিকেটের প্রভাব, অল্প শিক্ষিত বিনিয়োগকারী নেটওয়ার্ক, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ সংস্কৃতি দুর্বল। ভালো বাজার তৈরি হবে তখনই, যখন বিনিয়োগকারীরা জ্ঞান ও যুক্তির উপর বিনিয়োগ শুরু করবেন, গুজব নয়।
